প্রয়োজনে আত্মীয়, পরিচিত ব্যক্তি, বন্ধু বা ব্যবসায়িক অংশীদারের কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়া অনেকের জীবনেই ঘটে। কিন্তু টাকা ধার নেওয়ার বিষয়টি শুধু মৌখিকভাবে রাখলে পরবর্তীতে ভুল বোঝাবুঝি বা বিরোধ তৈরি হতে পারে। কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, কখন ফেরত দিতে হবে এবং কী শর্তে টাকা নেওয়া হয়েছে, এসব বিষয় লিখিতভাবে রাখলে উভয় পক্ষের জন্য বিষয়টি পরিষ্কার থাকে।
এ কারণে টাকা ধার নেওয়ার সময় অনেকেই হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা তৈরি করেন। এতে টাকা গ্রহণকারী ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ করার অঙ্গীকার করেন। প্রচলিত নমুনাগুলোতে সাধারণত প্রথম পক্ষ ও দ্বিতীয় পক্ষের পরিচয়, টাকার পরিমাণ, ফেরতের সময়সীমা, শর্ত এবং সাক্ষীদের স্বাক্ষরের বিষয় রাখা হয়।
এই লেখায় হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা কী, এতে কী কী তথ্য রাখা হয় এবং একটি প্রস্তুত ফরম্যাট কীভাবে কাজে লাগতে পারে, তা সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা কী?
হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা হলো টাকা ধার নেওয়ার বিষয়ে একটি লিখিত ঘোষণা বা অঙ্গীকারপত্র। এতে টাকা গ্রহণকারী ব্যক্তি উল্লেখ করেন যে তিনি নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা গ্রহণ করেছেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করছেন।
একটি সাধারণ অঙ্গীকারনামায় সাধারণত থাকে:
- টাকা প্রদানকারী ব্যক্তির পরিচয়
- টাকা গ্রহণকারী ব্যক্তির পরিচয়
- উভয় পক্ষের ঠিকানা
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য
- ধার নেওয়া টাকার পরিমাণ
- টাকা নেওয়ার কারণ
- টাকা ফেরত দেওয়ার তারিখ
- অন্যান্য শর্ত
- টাকা গ্রহণকারীর স্বাক্ষর
- সাক্ষীদের নাম ও স্বাক্ষর
প্রস্তুত নমুনাগুলোতেও পক্ষগুলোর নাম, ঠিকানা, পরিচয়পত্র নম্বর, টাকার পরিমাণ, ফেরতের সময়সীমা এবং সাক্ষীদের স্বাক্ষরের বিষয়গুলো রাখা হয়েছে।
টাকা ধার নেওয়ার সময় অঙ্গীকারনামা কেন করা হয়?
মৌখিকভাবে টাকা ধার দিলে পরবর্তীতে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে। যেমন, একজন বলতে পারেন ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল, অন্যজন বলতে পারেন ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। আবার টাকা ফেরত দেওয়ার তারিখ নিয়েও বিরোধ হতে পারে।
লিখিত অঙ্গীকারনামায় এসব তথ্য আগে থেকেই উল্লেখ করা থাকলে লেনদেনের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে সংরক্ষণ করা যায়।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিত নথি রাখা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে লেনদেনের তথ্য যাচাই করার জন্য একটি দলিল থাকে।
অঙ্গীকারনামায় কী কী তথ্য লিখতে হয়?
একটি হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা তৈরির সময় প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো পরিষ্কারভাবে লেখা উচিত।
১. প্রথম পক্ষের তথ্য
যিনি টাকা ধার দিচ্ছেন, তার পরিচয় সাধারণত প্রথম পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এখানে থাকতে পারে:
- নাম
- পিতার নাম
- মাতার নাম
- জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
- মোবাইল নম্বর
- বর্তমান ঠিকানা
- স্থায়ী ঠিকানা
- পেশা
২. দ্বিতীয় পক্ষের তথ্য
যিনি টাকা ধার নিচ্ছেন, তাকে সাধারণত দ্বিতীয় পক্ষ বা গ্রহীতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তার ক্ষেত্রেও নাম, পিতা-মাতার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা যেতে পারে।
ছবিতে দেখানো নমুনাতেও প্রথম পক্ষ ও দ্বিতীয় পক্ষের পরিচয় আলাদা করে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
কত টাকা হাওলাত নেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করুন
অঙ্গীকারনামার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো টাকার পরিমাণ।
শুধু অঙ্কে না লিখে অনেক ক্ষেত্রে অঙ্কের পাশাপাশি কথায় টাকার পরিমাণও লেখা হয়। যেমন:
৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা
এভাবে লিখলে টাকার পরিমাণ নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ কমে।
টাকার পরিমাণ লেখার সময় অঙ্ক ও কথায় লেখা পরিমাণ যেন একই হয়, সেটি অবশ্যই যাচাই করতে হবে।
টাকা ফেরত দেওয়ার তারিখ উল্লেখ করুন
শুধু কত টাকা নেওয়া হয়েছে তা লিখলেই অঙ্গীকারনামা সম্পূর্ণ হয় না। টাকা কখন ফেরত দেওয়া হবে, সেটিও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে:
“উক্ত টাকা আমি ৩০ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিশোধ করিব।”
তবে বাস্তবে যে তারিখে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছেন, সেই তারিখই ব্যবহার করা উচিত।
টাকা নেওয়ার কারণ উল্লেখ করা যায়
প্রয়োজনে কেন টাকা নেওয়া হয়েছে, সেটিও অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ করা যেতে পারে।
যেমন:
- ব্যবসার প্রয়োজন
- ব্যক্তিগত প্রয়োজন
- চিকিৎসার খরচ
- পারিবারিক প্রয়োজন
- জরুরি আর্থিক প্রয়োজন
তবে কারণ লেখার ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য ব্যবহার করা উচিত।
শর্ত থাকলে তা পরিষ্কারভাবে লিখুন
টাকা ফেরত দেওয়ার সময়সীমা ছাড়াও দুই পক্ষের মধ্যে যদি কোনো নির্দিষ্ট শর্ত থাকে, সেটি অঙ্গীকারনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
যেমন:
- নির্দিষ্ট তারিখে পুরো টাকা পরিশোধ করা হবে
- কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করা হবে
- নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে টাকা ফেরত দেওয়া হবে
- সময়মতো টাকা পরিশোধ না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়
তবে কোনো শর্ত লেখার আগে সেটির আইনগত প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
সাক্ষীদের তথ্য রাখা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অঙ্গীকারনামা সম্পাদনের সময় সাক্ষী রাখা প্রচলিত একটি বিষয়। প্রস্তুত নমুনাগুলোতেও সাক্ষীদের নাম ও স্বাক্ষরের জন্য আলাদা জায়গা রাখা হয়।
সাক্ষীর ক্ষেত্রে সাধারণত রাখা যেতে পারে:
- সাক্ষীর নাম
- ঠিকানা
- পরিচয়
- স্বাক্ষর
সাক্ষীরা বাস্তবে নথিতে স্বাক্ষর করেছেন কি না এবং নথিতে উল্লেখ করা তথ্য সঠিক কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অঙ্গীকারনামা তৈরির সময় কোন বিষয়গুলো খেয়াল করবেন?
হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা তৈরি করার সময় কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো।
তথ্যের বানান যাচাই করুন
নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে লিখুন।
টাকার পরিমাণ মিলিয়ে নিন
অঙ্কে ও কথায় লেখা টাকার পরিমাণ একই কি না যাচাই করুন।
তারিখ পরিষ্কারভাবে লিখুন
টাকা নেওয়ার তারিখ এবং টাকা ফেরত দেওয়ার তারিখ আলাদা করে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
ফাঁকা জায়গা রাখবেন না
চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষর করার আগে অপ্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা না রাখাই ভালো, যাতে পরে অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্য যোগ করার সুযোগ না থাকে।
সব পক্ষের সম্মতি নিশ্চিত করুন
নথিতে যে শর্ত লেখা হয়েছে, উভয় পক্ষ সেটি বুঝেছেন এবং সম্মত হয়েছেন কি না নিশ্চিত করা উচিত।
অঙ্গীকারনামা কি চুক্তিপত্রের মতো?
অঙ্গীকারনামা ও চুক্তিপত্র কাছাকাছি ধরনের নথি হলেও সব ক্ষেত্রে এগুলোকে একই অর্থে ব্যবহার করা ঠিক নয়। একটি চুক্তিপত্রে সাধারণত দুই বা ততোধিক পক্ষের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের বিস্তারিত শর্ত থাকতে পারে। অন্যদিকে অঙ্গীকারনামায় কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে একজন পক্ষের লিখিত অঙ্গীকার বা ঘোষণা থাকতে পারে।
টাকা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সম্মত শর্তগুলো বিস্তারিতভাবে লিখে রাখতে চাইলে চুক্তিপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। কোন ধরনের নথি আপনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত হবে, তা লেনদেনের ধরন অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
স্ট্যাম্প বা কাগজে অঙ্গীকারনামা করার বিষয়
অনলাইনে বিভিন্ন নমুনায় স্ট্যাম্প পেপারে অঙ্গীকারনামা করার পরামর্শ দেখা যায়। তবে স্ট্যাম্পের মূল্য, দলিলের ধরন, শুল্ক এবং নথির আইনগত কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। তাই শুধু কোনো অনলাইন নমুনা দেখে নির্দিষ্ট টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
আপনার লেনদেনের ধরন এবং নথিটি কোথায় ব্যবহার করা হবে, তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প ও আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রস্তুত অঙ্গীকারনামার ফরম্যাট কেন সুবিধাজনক?
শুরু থেকে একটি অঙ্গীকারনামা তৈরি করতে গেলে অনেকেই বুঝতে পারেন না কোন তথ্য আগে লিখবেন, পক্ষগুলোর পরিচয় কীভাবে সাজাবেন কিংবা স্বাক্ষর ও সাক্ষীদের জায়গা কোথায় রাখবেন।
এক্ষেত্রে একটি প্রস্তুত ফরম্যাট ব্যবহার করলে কাজটি সহজ হতে পারে। আগে থেকেই সাজানো কাঠামোর মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য বসিয়ে নথিটি প্রস্তুত করা যায়।

ছবিতে দেখানো “হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা” ফরম্যাটে টাকা গ্রহণকারী ও প্রদানকারীর তথ্য, ধার নেওয়া টাকার বিবরণ, ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার এবং স্বাক্ষরের অংশ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য অনুযায়ী ফরম্যাটটি সম্পাদনা করে ব্যবহার করা সহজ হতে পারে।
অঙ্গীকারনামা তৈরি করার আগে কী করবেন?
অঙ্গীকারনামা তৈরি করার আগে একটি ছোট তালিকা তৈরি করে নিলে ভুলের সম্ভাবনা কমে।
প্রথমে: কত টাকা লেনদেন হচ্ছে তা নিশ্চিত করুন।
এরপর: দুই পক্ষের পূর্ণ পরিচয় সংগ্রহ করুন।
তারপর: টাকা নেওয়ার ও ফেরত দেওয়ার তারিখ ঠিক করুন।
পরের ধাপে: কোনো অতিরিক্ত শর্ত থাকলে তা লিখুন।
সবশেষে: নথির প্রতিটি তথ্য যাচাই করে পক্ষ ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিন।
আইনগত বিষয়ে সতর্কতা
হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ফরম্যাট ব্যবহার করলেই সেটি সব পরিস্থিতিতে আইনগতভাবে যথেষ্ট হবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের টাকা, ব্যবসায়িক লেনদেন, সুদের বিষয়, জামানত, কিস্তি, চেক বা ভবিষ্যতে বিরোধের সম্ভাবনা থাকলে নথি তৈরির আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কারণ নথির আইনগত কার্যকারিতা শুধু ফরম্যাটের ওপর নির্ভর করে না; লেনদেনের প্রকৃতি, পক্ষগুলোর সম্মতি, নথির বিষয়বস্তু, প্রযোজ্য আইন এবং অন্যান্য পরিস্থিতিও বিবেচ্য হতে পারে।
উপসংহার
টাকা ধার নেওয়ার বিষয়টি মৌখিকভাবে না রেখে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করলে লেনদেনের শর্তগুলো পরিষ্কার থাকে। হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা তৈরি করার সময় দুই পক্ষের পরিচয়, টাকার পরিমাণ, টাকা ফেরতের তারিখ, প্রয়োজনীয় শর্ত এবং সাক্ষীদের তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি প্রস্তুত ফরম্যাট ব্যবহার করলে শুরু থেকে নথির কাঠামো তৈরি করার ঝামেলা কমে যায়। SohozKaj-এ থাকা হাওলাত টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা প্রয়োজনীয় তথ্য বসিয়ে নথি প্রস্তুতের একটি প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার বা কোনো আইনগত কাজে জমা দেওয়ার আগে নথির তথ্য এবং প্রযোজ্য আইনগত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে নেওয়া উচিত।








